সপ্তাহে ৫ হাজার কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

কোনোভাবেই ঋণের বোঝা মাথা থেকে সরছে না যুক্তরাষ্ট্রের বরং সংকট যেন আরও গভীর হওয়ার পর্যায়ে যাচ্ছে। দেশটির কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও) জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট ঘাটতিতে আরও ১ ট্রিলিয়ন বা ১০০ লাখ কোটি ডলার যোগ হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ মাস ধরে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫০ বিলিয়ন বা ৫ হাজার কোটি ডলার করে ঋণ নিয়েছে ট্রাম্পের কেন্দ্রীয় সরকার। (পাঁচ মাসে ২০ সপ্তাহ)
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হালনাগাদ করা সিবিওর মাসিক বাজেট পর্যালোচনা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, গত মাসেই সরকার আনুমানিক ৩০৮ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার ৮০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিবিও।
স্বাভাবিকভাবেই বেশি ঋণ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণের ওপর সুদের খরচও বাড়ছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর (যখন ২০২৬ অর্থবছর শুরু হয়) থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সরকারি ঋণের ওপর নিট সুদ বাবদ যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারিকে অর্থাৎ অর্থ মন্ত্রণালয়কে আগের বছরের তুলনায় অতিরিক্ত ৩১ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ১০০ ডলার খরচ করতে হয়েছে।
ফলে মাত্র পাঁচ মাসেই সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে ট্রেজারিকে মোট ৪৩৩ বিলিয়ন ৪৩ হাজার ৩০০ ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
সিবিও বলেছে, সুদ বাবদ ব্যয় বেড়েছে কারণ- ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের তুলনায় এখন ঋণের পরিমাণ বেশি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুদের হারও বেশি। তবে সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, স্বল্পমেয়াদি সুদের হার কমে যাওয়ায় সুদ পরিশোধের মোট ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা কমেছে।
অত্যন্ত বড় অঙ্কের এই ঘাটতি সত্ত্বেও আগের বছরের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একই সময়ে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ ছিল এ বছরের তুলনায় ১৪২ বিলিয়ন ডলার বেশি।
তবে এই উন্নতি বাজেট ঘাটতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নীতিনির্ধারকদের খুব বেশি আশ্বস্ত করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট শৃঙ্খলা জোরদারের দাবিতে সক্রিয় সংগঠন কমিটি ফর এ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেট (সিআরএফবি)-এর প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেছেন, চলতি বছর সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে এবং ২০৩৬ সালের মধ্যে তা ২ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি টেকসই হতে পারে না। ম্যাকগিনিয়াস আরও বলেন, আমাদের আর্থিক সমস্যাগুলো নিজে নিজে সমাধান হবে না। নীতিনির্ধারকদের একসঙ্গে বসে বাজেট ঘাটতি কমানোর বিষয়ে একমত হতে হবে। জিডিপির তুলনায় ৩ শতাংশ ঘাটতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা একটি ভালো সূচনা হতে পারে ও অর্থনীতির আকারের তুলনায় জাতীয় ঋণকে একটি টেকসই নিম্নমুখী পথে আনতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা অবশ্য মোট ঋণের পরিমাণ নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন। কারণ সরকারি ঋণ বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তাদের মতে, বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ঋণ-টু-জিডিপি অনুপাত, যা একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় ঋণের পরিমাণ নির্দেশ করে। এই অনুপাত যদি খুব বেশি ভারসাম্যহীন হয়ে যায়, তাহলে সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
যদিও জিডিপির তুলনায় ৩ শতাংশ বাজেট ঘাটতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা সরাসরি ঋণ-টু-জিডিপি অনুপাত নয়, তবু এটি সরকারি ঋণ নেওয়াকে দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি-টু-জিডিপি অনুপাত সাধারণত ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করেছে।
সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব
২০২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগের বছরের তুলনায় বাজেট ঘাটতি কিছুটা কমেছে, তবে তা ব্যয় কমানোর কারণে নয়। বরং সরকারের রাজস্ব আয় বেড়েছে, যা বেশি ব্যয়কে আংশিকভাবে সামাল দিতে সহায়তা করেছে।
বিশেষ করে, শুল্ক আদায়- যেমন আমদানি শুল্ক বা ট্যারিফ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব—গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। এতে অতিরিক্ত ১০৯ বিলিয়ন বা ১০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার রাজস্ব এসেছে। তবে ২০২৫ সালে আদায় করা কিছু শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ২০ ফেব্রুয়ারির একটি রায়ের কারণে আমদানিকারকদের ফেরত দিতে হবে।
তারপরও হোয়াইট হাউজ থেকে ঘোষিত নতুন শুল্কের কারণে রাজস্ব ঘাটতির প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকবে। একইভাবে ব্যক্তিগত আয়কর ও বেতনভিত্তিক সামাজিক বীমা কর থেকেও সরকারের আয় বেড়েছে। এই দুই খাত মিলিয়ে রাজস্ব ১৩২ বিলিয়ন বা ১৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪ বিলিয়ন বা ৬ হাজার ৪০০ ডলার বেশি। বিশেষ করে, মার্কিন সরকারের তিনটি বৃহত্তম ব্যয় কর্মসূচি- সোশ্যাল সিকিউরিটি, মেডিকেয়ার ও মেডিকেইডে ব্যয় বেড়েছে ১০৪ বিলিয়ন বা ১০ হাজার ৪০০ কোটি ডলার।
এছাড়া প্রতিরক্ষা বিভাগ ও ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স বিভাগেও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে কৃষি বিভাগ, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এবং শিক্ষা বিভাগ তাদের ব্যয় কিছুটা কমিয়েছে।
এছাড়া পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) জানিয়েছে, তাদের ব্যয় ২০ বিলিয়ন বা ২০০ কোটি ডলার কমেছে। কারণ ২০২৪ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে সংস্থাটি ২০২২ সালের রিকনসিলিয়েশন আইনের আওতায় চালু হওয়া একটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অনুদান কর্মসূচির অধীনে ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল।
সূত্র: ফরচুন
এসএএইচ


http://dlvr.it/TRSx7x

1 Comments

Previous Post Next Post